বাংলাদেশে কোথায় প্রথম লিফট প্রতিস্থাপিত হয়েছিল তার সঠিক তথ্য  না পেলেও একটা ধারনা পাওয়া যায়  যে পাকিস্থান পিরিওডে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, আমিন কোর্ট, জহুরুল ইসলামের মতিঝিল অফিস , ইস্পাহানী কোম্পানীর মতিঝিল অফিস, হোটেল পুর্বানী, জীবন বিমা ভবনে  সম্ভবত অটিচ লিফট প্রতিস্থাপিত হয়েছিল।

সেই সময়ঃ
মার্কেট লিডার ছিল সিন্ডলার – আজিজ এন্ড কোং। পরবর্তী স্থানে হাউসান- ক্রিয়েটিভ ইন্জিনিয়ার্স। ওটিস – লাবনী কর্পোরেশন, ফিয়াম পরবর্তীতে কোনে – টার্নার গ্রাহাম, সাবিয়াম – রহমান এন্ড কোং ইত্যাদি ব্রান্ড এবং প্রতিষ্ঠান মোটামুটি ভাল অবস্থানে ছিল। আরও একটি প্রতিষ্ঠান লিফট ও বৈদ্যুতিক শিল্প ব্যাংক ভবন প্রথম ২২ তলা ভবনে নিপ্পন জাপানের লিফট সরবরাহ করলেও পরবর্তীতে খুব একটা সুবিধে করতে পারে নাই। শেষের দিকে প্রফেশনাল ইন্জিনিয়ার্স ভালই করছিল। সেলিম ট্রেডিং, বশির এন্ড কোং বহু আগেই এবং পরবর্তীতে অগ্রনি ইন্জিনিয়ার্স এই সেক্টরে ব্যাবসা গুটিয়ে নিয়েছিল।
এই সময়ঃ
সিন্ডলার হাত বদল হবার পর থেকে আজিজ এন্ড কোং তাঁদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে নাই। ক্রিয়েটিভ সিন্ডলার নিয়ে তাঁদের অবস্থান বজায় রেখেছে। ৯০’র দশকের শুরুথেকে মান বাংলাদেশ এলজি পরবর্তীতে সিগমা নিয়ে দাপটের সাথে বাজার দখল করে এখন প্রায় নিস্ক্রিয়। ওটিস একাধিকবার হাত বদল হয়ে প্রায় হারিয়ে গেছে এখন নূতন করে এস এস জি কি করে তা দেখার অপেক্ষা। টার্নার গ্রাহাম নূতন করে ঘুরে দারিয়ে বেশ ভাল করছে। মিটসুবিসি, সাংহাই মিটসুবিসি, থিসেনক্রুপ, মাশিবা, লিফট মিউনিখ বেশ ভাল অবস্থানে আছে। হুন্দাই আমার বিবেচনায় খুব ভাল একটা প্রডাক্ট হওয়া সত্বেও তার অভিস্ট লক্ষ্যে পৌছাতে পারে নাই।
দ্বিতীয় সারিতে অনেকেই খুব ভাল করছে।

৯০’র দশকের শুরু থেকে কোরিয়ান প্রোডাক্ট বাংলাদেশে আসা শুরু করে মাঝামাঝি সময় থেকে মার্কেট ডমিনেট করা শুরু করে।

২০০০ এর শুরু থেকে চায়না বাজারে প্রবেশ করে।

৯০’র দশকের শুরু থেকে বাজার সম্প্রসারন হতে থাকে। আবাসন শিল্প সম্প্রসারনের সাথে সাথে ছোট সাইজ এবং উচ্চতার লিফটের চাহিদা এবং সেই সাথে এ্যসথেটিক ভিউ এবং রাইডিং কমর্ফোটের চাহিদা বাড়তে থাকে। ইরোপিয়ান ব্রান্ড গুলির এ্যসথেটিক ভিউ সেই সময় চাহিদা অনুযায়ী ছিল না। রাইডিং কমর্ফোর্ট নিশ্চিত করতে যেয়ে সেই সময় এসি টু থেকে এসি ভি ভি ড্রাইভ এর প্রচলন করা হয় যাতে করে খরচ অনেক বেড়ে যায়। এসি ভি ভি ড্রাইভ কে হ্যান্ডেল করার জন্য রিলে টাইপ কন্ট্রোলের যায়গায় প্রাথমিক ভাবে পি এল সি কন্ট্রোলের প্রচলন করা হয়। সেই সময় এই প্রযুক্তি হ্যান্ডেল করার জনবলের প্রবল ঘাটতি ছিল। সব কিছু মিলিয়ে একটা অস্থির সময় পার করছিল এই সেক্টর। এক দিকে উন্নত প্রযুক্তি, জনবলের ঘাটতি, দাম বেড়ে যাওয়া অন্যদিকে ক্রেতাদের সল্পমূল্যে দৃস্টিনন্দন লিফট সরবরাহের চাপ যা ইউরোপিয়ান ব্রান্ড গুলো সেই সময় যোগান দিতে ব্যর্থ হয়। আর এই সুযোগ টি প্রথমে কোরিয়া এবং পরবর্তীতে চায়না দখল করে নেয়।

ভূতাত্তিক দিক থেকে চায়না একটা বিশেষ সুবিধা ভোগ করে আর তা হচ্ছে দেশটির আয়তন আর জনসংখ্যা। যে কারনে এই শিল্পটি চায়নায় বেশ শক্ত একটা ভিত গরে নেয়। তাঁদের নিজস্ব বাজার সারা প্রথিবীর প্রায় অর্ধেক এবং সস্তা জনবল এর কারণে তাদের প্রডাকশন কস্ট অন্য যে কোন দেশের চাইতে কম। একই মানের পন্যের উৎপাদন খরচ ইউরোপ বা কোরিয়ায় তুলনামুলক ভাবে বেশি। বাজারের সাইজ বড় হওয়ার কারনে ইন্ডাস্ট্রি গুলোর সাইজ ইউরোপ বা কোরিয়ার চাইতে অনেক বড়। উন্নত প্রযুক্তি, মান সম্মত পন্য, তুলনামুলক সাশ্রয়ি মূল্য এবং সহজ যোগাযোগ ব্যাবস্থার কারনে চায়না বর্তমানে বাজারকে ডমিনেট করছে।

আমার প্রতিষ্ঠান থেকে চায়নার একটি ব্রান্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছিলাম তৃতিয় সারির অবস্থান থেকে। আমাদের চেষ্টা ছিল একটি ব্রান্ড ইমেজ তৈরি করা। বর্তমানে আসল নকল মিলিয়ে অনেকেই এই ব্রান্ডকে প্রমোট করছে। আমরা ব্যাবসায়িক ভাবে কিছুটা ক্ষতগ্রস্থ হয়েছি। তারপরও একটা ভাললাগা কাজ করে। এত নীরবে নিভৃতে কাজ করার পরও কেউ না কেউতো আমাদের অনুসরন করছে। মন্দ কি!

প্রস্তুত কারক ঘনঘন এজেন্ট পরিবর্তন বা একাধিক এজেন্ট নিয়োগ করার পিছনে অনেক গুলো কারন কাজ করে। চায়নার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ইংরেজি না জানার কারনে তাঁদের সেলস পার্সন তাঁদের ভুল বোঝানোর সুযোগ থাকে। সেলস পার্সন তাঁর টার্গেট ফিলআপ করার জন্য মনে করতে পারে একজন এজেন্ট যদি পন্চাশ টা বিক্রি করে তবে দশজন এজেন্ট থাকলে পাঁচশ টা বিক্রি হবে!

আমাদেরও একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছে অন্যের তৈরীকরা রাস্তায় হাটা। নিজের রাস্তা নিজেই তৈরী করার সাহস, সময়, শ্রম কোনোটাই আমরা খরচ করতে চাইনা। তাই অন্যের তৈরীকরা রাস্তায় হেটে সল্প সময়ে উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাই। যতক্ষন নিজের আইডেন্টিটি তৈরী করার মানসিকতা তৈরী না হচ্ছে ততক্ষন এমন অবস্থা চলতেই থাকবে। উপযুক্ত প্রস্তুতি ছাড়া ব্যাবসায় নামার কারণে এমন বৈরী পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে।

ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয় ব্যাবসায় একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যার ডিমান্ড আছে তার সাপ্লাই থাকবে আবার যার সাপ্লাই আছে তার ডিমান্ডও তৈরি হবে। যেমন আমাদের দেশে ড্রাগ আমদানি বৈধ নয়। তথাপিও যেহেতু তার ডিমান্ড আছে তাই তার সাপলাইও আছে যা সর্বৈব অবৈধ। তেমনি ভাবে আমাদের দেশে নিম্নমানের লিফটএর চাহিদা আছে বিধায় তার সাপ্লাইও আছে। সরকার যেমনিভাবে ড্রাগ ইস্যু মোকাবিলার জন্য এর চাহিদা এবং সাপ্লাই দুই এন্ডেই প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তেমনি ভাবে কোন এক সময় আমাদের সেক্টরেও এমনি নজরদারী প্রতিষ্টাপাবে এবং ডিমান্ড ও সাপ্লাই এন্ডে নকল বা নিম্নমানের দৌরাত্ব কমে আসবে।

উপদেশ দেবার মত ধৃষ্টতা আমার নেই। নিজের জীবন থেকে শেখা কতগুলো বিষয় শেয়ার করতে পারি:
1. নিজের আইডেনটিটি তৈরী করার লক্ষ্যে কাজ করা
2. শর্টকাট রাস্তা পরিহার করা। শর্টকাটে সাময়িক লাভবান হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
3. জীবনের চর্তুপাশে প্রচুর প্রলোভনের হাতছানি থাকে, প্রলোভন থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
4. পরশ্রিকাতর না হয়ে নিজের অর্জনের প্রতি আস্থা রাখা।
5. সাদাকে সাদা, কাল কে কাল হিসেবে দেখার সাহস রাখা।
6. নিজের মর্যাদা বজায় রাখা।
7. কাল্পনিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হওয়া।
8. নিজের লক্ষ্য স্থির করে তা অর্জনের জন্য রুটম্যাপ তৈরী করা এবং প্রতিনিয়ত সেই দিকে যাচ্ছি কিনা তা মনিটর করা।
9. নিজের শক্তিগুলোকে সামনে রাখা আর দুর্বলতাগুলোকে শক্তিতে রুপান্তর করার জন্য চেষ্টা করা।
10. অন্যের প্ররোচনায় নিজস্বতাকে পরিহার না করা।
11. নিজের প্রতি কমিটেড থাকা।
12. সর্বপরি নিজেকে একজন ভালমানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকা।
বর্তমানে তরুনরা অনেক আধুনিক এবং সময়োপযোগী। তাঁরা অনেক ভাল করছে। ছোট খাট ব্যাত্তয় গুলোকে পরিহার করে একটু ধৈর্যের সাথে এগুলে অনেক ভাল করবে। সামনে সুদিন আসছে, তাকে মোকাবেলা করার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। রাত পেরিয়ে সকাল আসবেই।
আমার সিমীত জ্ঞ্যান এবং সিমাবদ্ধতার কারণে উপরোক্ত পর্যালোচনা এবং পর্যবেক্ষন শতভাগ সঠিক না হলেও কাছাকাছি থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। অনিচ্ছাকৃত ভুল ত্রুটি মার্জনা করবেন। আমি শুধু পরিস্থিতি বিশ্লেষনের চেষ্টা করেছি। কাউকে আঘাত করা বা হেয় করা মোটেও আমার উদ্দেশ্য নয়।

লেখক: ইমদাদুর রহমান ফিরোজ, পরিচালক, অরবিট টেকনোলজি